জেবা আমি না খান গতকাল পর্যন্ত চিনতাম না।
গুগল করে জানলাম ভদ্রমহিলার বিয়েই হয়েছে ১৯৮৩ সালে। সে হিসেবে বয়স প্রায় সত্তরের কাছাকাছি।
তিনি বাংলাদেশের অ্যাসেট।না বুঝে না জেনে ট্রল করা মহাপাপ,,
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের আবিষ্কার কখনোই খারাপ হতে পারে না একটু ধৈর্য ধরে শুনুন একটু জানতে চেষ্টা করুন । ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাকে যখন জনাব তারেক রহমান সাহেব এনেছিল, একই রকম ট্রল হয়েছিল,,,
সংসদে তাঁর একটি বক্তব্যের ছোট্ট অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর অনেকের মতো আমিও বিষয়টি দেখেছি। সেই ক্লিপ ঘিরে এবং সঙ্গে তার পোশাক এবং ফিচার নিয়ে চলছে ট্রল, ব্যঙ্গ, উপহাস, বিকৃত উল্লাস।
আমি রাজনীতি সচেতন মানুষ । তাই তিনি কোন দলের, কী পরিচয়ের মানুষ, এসব আমার জানা ছিল । কিন্তু ওইটুকু বক্তব্যের উচ্চারণ শুনে তাকে মোটেও অদক্ষ বা অশিক্ষিত কেউ মনে হলো না। বরং বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষার উচ্চারণ বেশ সুন্দর আলাদা আলাদাভাবে। দুই ভাষার মিক্সিং টা আমার খুব ভালো লেগেছে, এটাকে বলে বাউন্স বল । বাংলায় বলতে চেয়েছেন কিন্তু খুব সম্ভবত তিনি বাংলায় fluent নন। অনেক বছর বিদেশে থাকবার কারণে এটা হতে পারে। তিনি পুরো বক্তব্য বেশ সুন্দরভাবে দিয়ে শেষের দিকে এসে বক্তব্যের একটি পর্যায়ে ভাষা বদলাতে গিয়ে কিছুটা থমকে গিয়েছিলেন, আর সেই মুহূর্তটুকুই আমাদের বিনোদনের উপাদান হয়ে গেছে।এটা আনন্দের শহীদ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
অথচ পুরো বক্তব্যের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শুনলে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। শিশুদের নিয়ে তাঁর ভাবনা, একজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের মা হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা, সমাজ সম্পর্কে তাঁর পর্যবেক্ষণ, এসব নিয়ে তিনি যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলেছেন। কিন্তু আমরা পুরো মানুষটিকে দেখিনি, পুরো বক্তব্যও শুনিনি। আমরা দেখেছি মাত্র কয়েক সেকেন্ডের একটি বিচ্ছিন্ন মুহূর্ত।
এই বয়সে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংসদে উঠে দৃঢ় কণ্ঠে কথা বলা, নিজের অবস্থান তুলে ধরা, এটাও তো এক ধরনের সাহস। সংসদে হয়তো তিনি নতুন, হয়তো প্রথম অভিজ্ঞতার চাপ ছিল, হয়তো মুহূর্তের জন্য ভাষার ছন্দ কেটে গিয়েছিল। এমনটা কার না হয়?
আমাদের জীবনে কি কখনো অস্বস্তিকর মুহূর্ত আসেনি? কখনো কি কথা আটকে যায়নি? ভুল শব্দ উচ্চারণ করিনি? ভুল জায়গায় ভুল কথা বলিনি? যদি হয়ে থাকে, তবে একজন প্রবীণ নারীকে নিয়ে এমন নির্মম উপহাসের আনন্দ আমরা কোথায় পাই?
আমরা তাঁর বক্তব্যের সারবস্তু নিয়ে আলোচনা করছি না, আমরা তাঁর পোশাক নিয়ে কথা বলছি, তাঁর উচ্চারণ নিয়ে কথা বলছি, তাঁর সাময়িক হোঁচট খাওয়া নিয়ে হাসাহাসি করছি। যেন একজন মানুষের পুরো জীবন, অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ও অবদানকে কয়েক সেকেন্ডের একটি ক্লিপে মাপা যায়।
কখনো কখনো ট্রল আমাদের রসবোধের পরিচয় দেয় না, বরং আমাদের রুচির সীমাবদ্ধতাকেই প্রকাশ করে।
একজন সত্তরোর্ধ্ব নারীর একটি মুহূর্তের বিচ্যুতিকে জাতীয় বিনোদনে পরিণত করার আগে আমাদের নিজেদের প্রতিও একবার প্রশ্ন করা উচিত, আমরা কি সত্যিই এতটা নিখুঁত?
যাকে নিয়ে এত হাসাহাসি করছেন ইউটিউবে তার আগের ইন্টারভিউ এর ছোট ছোট ক্লিপস আছে, কমেন্ট সেকশনে দিয়ে দিলাম। এই মহিলা আমাদের অনেককেই কানে ধরে দুই বেলা ইংরেজি শেখানোর ক্ষমতা রাখেন।
কিছুদিন আগে আরেকজন নারী এমপিকে নিয়ে একইধরনের দৃশ্য দেখেছিলাম। তিনি সংসদের করিডোরে একজন সহকর্মীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন, হাসছিলেন। একটি সাধারণ, স্বাভাবিক মুহূর্ত। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই দৃশ্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হলো, যেন সেখানে কোনো বড় ধরনের দুর্যোগ ঘটে গেছে।
ভিডিওর একটি বিশেষ অ্যাঙ্গেল বেছে নিয়ে সেটিকে বিকৃত ব্যাখ্যা দেওয়া হলে, ট্রল, কটূক্তি আর চরিত্রহনন করা তখন খুব সহজ হয়ে যায়। অথচ বাস্তবে সেই সম্মানিত নারী কোনো অশালীন পোশাক পরেননি, কোনো অনভিপ্রেত আচরণও করেননি। তিনি যথেষ্ট উচ্চশিক্ষিত, সচেতন এবং শালীন মানুষ। ভিডিওতে কোনই সমস্যা ছিল না, সমস্যা ছিল কিছু রুচিহীন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে।
আপনার চোখ যদি বিকৃত কিছু খুঁজতে চায়, তাহলে মানুষ বস্তার ভেতর ঢুকেও রেহাই পাবে না কেউ। আপনি দোষ খুঁজে নেবেনই। কারণ তখন আপনার মানসিকতাই ওভাবে বিচার করার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে।
আল্লাহর দুনিয়ায় মানুষের ৩৬৫ টা দিন কখনো একরকম যায় না। জীবনের কোনো না কোনো মুহূর্তে আমরা সবাই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ি। কখনো কথায়, কখনো আচরণে, কখনো পোশাকে, কখনো সিদ্ধান্তে। কার এমন একটি মুহূর্ত নেই, যা ভুল, দ্বিধা বা অস্বস্তি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
কিন্তু আজকাল আমরা মানুষের পুরো জীবনকে বিচার করি তার সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্তটি দিয়ে। একটি কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও, একটি স্থিরচিত্র, একটি ভুল উচ্চারণ বা একটি অপ্রস্তুত প্রতিক্রিয়াকে সামনে এনে আমরা যেন একজন মানুষের সমগ্র পরিচয় নির্ধারণ করে ফেলি।
অথচ একজন মানুষ তার একটি মুহূর্ত নয়। সে তার দীর্ঘ পথচলা, তার সংগ্রাম, তার শিক্ষা, তার অভিজ্ঞতা, তার সাফল্য, তার ব্যর্থতা, সবকিছুর সমষ্টি।
আপনি কারও জীবনের হাজারো ভালো কাজ, অর্জন ও অবদানকে উপেক্ষা করে তার একটি বিচ্যুত মুহূর্তকে সামনে আনতে পারেন। কিন্তু তাতে সেই মানুষটির প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় না, বরং প্রকাশ পায় আমাদের বিচারবোধের সীমাবদ্ধতা।
আরও অবাক লাগে, এই ট্রলের মিছিলে শুধু পুরুষ নয়, অনেক নারীও যোগ দেন। পুরুষদের একটি অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে করে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু অনেক নারীও না বুঝে সেই একই বিদ্রুপের সুরে গলা মেলান। হয়তো তারা বুঝতেই পারেন না, প্রতিটি শেয়ার, প্রতিটি হাসির ইমোজি, প্রতিটি কটাক্ষ ভবিষ্যতের অন্য কোনো নারীর পথকে একটু একটু করে কঠিন করে দিচ্ছে।
কারণ বিষয়টি শুধু একজন নারী এমপি, একজন অভিনেত্রী বা একজন পেশাজীবী নারীকে নিয়ে নয়। বিষয়টি হলো সমাজ নারীর উপস্থিতিকে কতটা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শিখেছে।
যখন একজন নারী প্রকাশ্য পরিসরে আসবেন, নেতৃত্ব দেবেন, কথা বলবেন, মত প্রকাশ করবেন, আর তার কাজের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে তার শরীর, পোশাক, হাসি বা ভঙ্গি, তখন অন্য নারীরা একটি স্পষ্ট বার্তা পেয়ে যায়, সামনে এগোলে আপনাকেও একই মূল্য দিতে হবে।
এভাবে আমরা শুধু একজন নারীকে অপমান করি না আমরা আরও অনেক নারীকে থামিয়ে দিই।
তাই এসব ট্রলকে নিছক হাসি-ঠাট্টা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এগুলো সেই পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে নারীদের প্রতিনিয়ত নিজেদের যোগ্যতার চেয়ে বেশি প্রমাণ দিতে হয়, আর পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি জাজমেন্ট সহ্য করতে হয়।
যে সমাজ সত্যিই নারীর অগ্রগতি চায়, সে সমাজ নারীর কাজ, চিন্তা ও অবদান নিয়ে আলোচনা করবে, তার শরীর, পোশাক, হাসি বা একটি স্থিরচিত্র নিয়ে নয়। নারীদের নিয়ে যত বেশি ব্যঙ্গ-বিদ্রুপকে স্বাভাবিক করা হবে, ততই আগামী দিনের নারীদের সামনে নতুন নতুন বাধা তৈরি হবে। সেই নারী হতে পারে আপনার বোন, আপনার কন্যা, আপনার নাতনি, আপনারই বংশধর। আর সেই ক্ষতি কোনো একক নারীর নয়, পুরো সমাজের। আরো মনে রাখুন আজ যাকে নিয়ে হাসছেন, কাল সেই অপ্রস্তুত মুহূর্তটি আপনার নিজের জীবনেও আসতে পারে।
এডঃ মোহাম্মদ আতাউর রহমান মোল্লা
অতিরিক্ত পি পি
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত।