ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে রাজপথে রক্তে ভেজা রাজনীতিক: ব্যক্তি জয়নাল আবদিন ফারুক কি পেলেন ত্যাগের স্বীকৃতি এ দেশে রাজনীতির ইতিহাসে ক্ষমতার গদি আর রাজপথের ধুলোবালির মধ্যে যে দুস্তর ব্যবধান, তা বোঝার জন্য কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু জয়নাল আবদিন ফারুকের মতো একজন নেতার শরীরের দিকে তাকানো। যে শরীরে এখনো মিশে আছে ২০১১ সালের ৬ জুলাইয়ের সেই তপ্ত দুপুরের ক্ষত। মানিক মিয়া এভিনিউয়ের রাজপথে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্যকে যখন পুলিশের বুট আর লাঠির আঘাতে রক্তাক্ত হতে দেখেছিল দেশবাসী, সেদিন শুধু একজন ব্যক্তি জয়নাল আবদিন ফারুক আহত হননি আহত হয়েছিল এদেশের গণতন্ত্র আর সংসদীয় মর্যাদা।
১৯৪৯ সালের ১০ ডিসেম্বর সেনবাগের উর্বর মাটিতে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির পাঠ নিয়েছেন রাজপথ থেকে। তখন থেকেই তিনি শিখেছেন, রাজনীতি মানে ভোগ নয়, রাজনীতি মানে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া। স্বাধীনতা-পরবর্তী অস্থির সময়ে যে তরুণেরা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, জয়নাল আবদিন ফারুক তাঁদেরই একজন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর আদর্শকে বুকে ধারণ করে নোয়াখালীর মাটি ও মানুষের সঙ্গে গড়ে তুলেছেন এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন।
পাঁচ-পাঁচবার ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সংসদে গিয়েছেন তিনি। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ প্রতিটি নির্বাচনেই নোয়াখালী-১ ও ২ আসনের মানুষ তাঁকে আপন করে নিয়েছে। এটা কেবল দলীয় জোয়ার ছিল না, ছিল তাঁর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা আর বিপদে-আপদে মানুষের পাশে থাকার স্বীকৃতি। ২০০৯ সালে তিনি যখন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ হিসেবে দায়িত্ব নিলেন, তখন সংসদের ভেতরে তাঁর কণ্ঠ হয়ে উঠেছিল শোষিতের প্রতিবাদ। তিনি কেবল একজন সাংসদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন রাজপথ আর সংসদের এক সেতুবন্ধন।
কিন্তু তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রাপথ কি কুসুমাস্তীর্ণ ছিল? না, বরং সেটি ছিল কণ্টকাকীর্ণ। ২০১১ সালের সেই ভয়াল দিনে তেজগাঁওয়ের তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তাদের হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হওয়ার দৃশ্য আজও মানুষের চোখে পানি আনে। একজন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপকে যখন রাজপথে ফেলে পৈশাচিক উল্লাসে পেটানো হয়, তখন সভ্যতার মুখ থুবড়ে পড়ে। সেই দিনের সেই ছবিগুলো আজও গণতন্ত্রকামী মানুষের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। অথচ সেই হার না মানা মানুষটি দমে যাননি। বারবার জেল খেটেছেন, হুলিয়া মাথায় নিয়ে ঘুরেছেন, তবুও দলের প্রতি, আদর্শের প্রতি অবিচল থেকেছেন।
২০১৩, ২০১৫ কিংবা ২০১৮ প্রতিটি আন্দোলন ও নির্বাচনের সময় তিনি হয়েছেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। তাঁর গাড়িবহরে হামলা হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে পাহাড়সম মামলা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জয়নাল আবদিন ফারুক প্রতিটি প্রতিকূলতাকে জয় করেছেন ধৈর্য আর সাহসের সাথে। ২০১৭ সালে দীর্ঘ কারাবাস শেষে যখন তিনি মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিলেন, তখন তাঁর চোখে ছিল না প্রতিশোধের স্পৃহা, বরং ছিল দেশপ্রেমের এক দীপ্ত আভা।
নোয়াখালী-২ আসনের মানুষের আজ একটাই আরজি একজন মানুষ কতটুকু ত্যাগ স্বীকার করলে তাঁকে রাষ্ট্রপরিচালনার মঞ্চে যোগ্য স্থান দেওয়া হয়? ত্যাগের কি কোনো মাপকাঠি আছে? দীর্ঘ সংসদীয় অভিজ্ঞতা, পাঁচবারের বিজয় এবং রাজপথে জীবন বাজি রাখা এই নেতার মূল্যায়ন আজ সময়ের দাবি। রাজনীতিতে অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নেই। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাঁর মতো একজন পোড়খাওয়া মানুষের উপস্থিতি দলকে শুধু সমৃদ্ধই করবে না, বরং তরুণ প্রজন্মের কাছে এক অনন্য বার্তা দেবে যে ত্যাগ বৃথা যায় না।
দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে যখন আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, তখন জয়নাল আবদিন ফারুকের মতো ‘লিভিং লিজেন্ড’-দের সঠিক মূল্যায়ন হওয়া জরুরি। আঞ্চলিক ভারসাম্য আর সাংগঠনিক দক্ষতার বিচারে তিনি নিঃসন্দেহে মন্ত্রিসভার এক যোগ্য দাবিদার।
নোয়াখালীর সাধারণ মানুষ আজ অশ্রুসজল চোখে তাকিয়ে আছে। তারা চায় তাদের প্রিয় ‘ফারুক ভাই’ কেবল রাজপথের লড়াকু সৈনিক হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রপরিচালনার দক্ষ কাণ্ডারি হিসেবে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিন। রাজনীতির অমোঘ সত্য এই যে, ক্ষমতা আসে এবং যায়, কিন্তু ত্যাগের ইতিহাস অক্ষয় হয়ে থাকে। জয়নাল আবদিন ফারুকের দীর্ঘ সংগ্রামের ফসলে যদি সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলের ছোঁয়া লাগে, তবেই সার্থক হবে তাঁর শরীরের প্রতিটি রক্তবিন্দু।
গণতন্ত্রকে অর্থবহ করতে হলে ত্যাগী ও অভিজ্ঞ নেতাদের যোগ্য আসনে বসানো ছাড়া গত্যন্তর নেই। জয়নাল আবদিন ফারুক কি পাবেন সেই কাঙ্ক্ষিত স্বীকৃতি? উত্তরটি সময়ের গর্ভে থাকলেও, কোটি মানুষের দোয়া আর ভালোবাসা তাঁর সাথেই আছে।
তাই নোয়াখালী ২ আসনের জনগণের দাবি জয়নাল আবদীন ফারুককে মন্ত্রীসভা স্থান দিয়ে তার ত্যাগের মূল্যায়ন করা হোক।