এক দেশের নির্বাচন পরিচালনা বোর্ডের কমিশনার ৮০টি রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন দিয়ে বিজ্ঞপ্তি দিলেন, কাল সকল দলের প্রধানকে নির্বাচন অফিসে আসতে হবে এবং একজন একজন করে লিখিতভাবে জানাতে হবে যে, ক্ষমতায় গেলে পরের নির্বাচন ক্ষমতা ছেড়ে নিরপেক্ষ করবেন নাকি ক্ষমতায় বসে পরের বারও তামাশার নির্বাচন করবেন। যারা তামাশার নির্বাচন করবেন বলে অঙ্গীকার করবেন তারা আমার ভবনের সামনে বেধে রাখা গরুগুলো থেকে একটি করে গরু নিয়ে যাবেন। আর যারা নিরপেক্ষ নির্বাচন করবেন তারা একটা করে ছাগল নিয়ে যাবেন। পরদিন একজন একজন করে দলের প্রধানরা নির্বাচন কমিশন অফিসে এসে লিখিত দিয়ে বের হওয়ার সময় একটি করে গরু নিয়ে বের হলেন। মানে তারা ক্ষমতায় গিয়ে আজীবন ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য তামাশার নির্বাচন করবেন।
কমিশনার ভাবলেন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, এখনো কি এমন একজনকেও পাওয়া যাবে না যিনি ক্ষমতা ছেড়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন করবেন? এমন সময় মাথায় টাক, মুখে সাদা ঘন গোঁফ, দাড়িবিহীন ইয়া লম্বা একজন দলীয় প্রধানের প্রবেশ। তিনি যথারীতি অঙ্গীকার জমা দিয়ে অফিসের সামনে রাখা একটা ছাগলের রশি হাতে তুলে নিয়ে ছাগল সহ বের হচ্ছেন।
অফিসের সামনে অপেক্ষামান অন্যান্য দলীয় প্রধান ও উৎসুক জনতা হতবাক হয়ে অনেকেই জানতে চাইলেন, ‘’আপনি কি আমেরিকা নাকি লন্ডন থেকে এসেছেন? উত্তরে লোকটি বললেন, নারে না, আমি এ দেশেরই লোক। দেশটাকে এ পর্যায়ে এনে দিতে আমার পরিবারের অনেক অবদান আছে। আমি চাই দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসুক। দেশের উন্নয়ন হোক। জনগণ চাইলে আমি পরের বারও ক্ষমতায় থাকবো, আর না চাইলে না। নির্বাচন কমিশনারেরও মুখে হাসি , এ বুঝি ভাল একটা দল পাওয়া গেল।
পরদিন সকালে ছাগলটা নিয়ে আবার নির্বাচন কমিশনে ফিরে এলো লোকটি। কমিশনার তাকে দেখে তো হতবাক। আরে আপনি ছাগল নিয়ে ফিরে এলেন? লোকটি বললো, ”আমি গতকাল ছাগলটি নিয়ে পার্টি অফিসে গেলে আমার সকল নেতা-নেত্রী ছাগল দেখে চেঁচামেচি দিয়ে বলে উঠলো, আপনি গরু না এনে ছাগল আনলেন কেন? ক্ষমতা ছেড়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন দিলে আপনি আমরা কেউ কি পুনরায় বিজয়ী হতে পারবো ? কখনও না। কারন আমরা ক্ষমতায় গেলে আমাদের প্রথম কাজ হবে নিজের উন্নয়ন করবো, সবাই মিলে দেশটাকে চুষে খাব। প্রত্যকেটা দল নেতা গরু নিয়ে বের হলো, আর আপনি পুচ্ছি একটা ছাগল নিয়ে এলেন?” তাই আমি ছাগলটি ফিরিয়ে দিয়ে গরু নিয়ে যেতে চাই।
কমিশনার একদৃষ্টে লোকটির দিকে তাকিয়ে রইলেন আর ভাবলেন, এ দেশে একটিও ভাল রাজনৈতিক দল পাওয়া যায় নি। সবাই ছোট পশু ছাগলের দিকে একবারও না তাকিয়ে বড় পশু গরুর লোভ সামলাতে পারে নি। এদের যারাই ক্ষমতায় যাবেন, তারা রাষ্ট্রীয় কোষাগার শূণ্য না হওয়া পর্যন্ত ক্ষমতাকে চিরদিনের জন্য আঁকড়ে ধরতে চায়।
এমন সময় ইসি কক্ষে বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের প্রবেশ। এক সাংবাদিক জানতে চাইলো, যারা তামাশার নির্বাচন করতে আগ্রহী তাদের জন্য আপনি গরু বরাদ্দ রেখেছেন কেন? ছাগল বরাদ্দ করলে হতো না? ছাগল তো ছোট প্রাণী, স্বাভাবিকভাবে সবাই গরু পেতে চাইবে। এখানকার নেতা, মহানেতা থেকে শুরু করে সবাই লোভী ও নগদে বিশ্বাসী।
আরেকজন সাংবাদিক বললেন,আপনি তামাশাকারীদের জন্য গরু বরাদ্দ না রেখে ছাগলের মত একই মূল্যের অন্য কিছু বরাদ্দ দিলেই তো পারতেন না?
কমিশনার বললেন, আরে বুঝছেন না কেন? যত বড় প্রকল্প তত বড় আমার আয়। একটা ছাগল থেকে আমি ৫/৮ শত টাকা আয় করতে পারমু, আর একটা গরু থেকে ৫/৮ হাজার টাকা আয় করতে পারবো। ৮০টি ছাগলের চেয়ে ৮০টি গরুতে আমার ১০ গুন বেশি আয়………সরি! সরি!! কী বলতে কী বলে ফেলে ফেললাম। গোপন কথাটা ফাঁস করেই দিলাম। সরি, সাংবাদিক বন্ধুরা, সরি!
সাংবাদিকরা বললেন, আপনাকে আর সরি বলতে হবে না, গরুর আয় থেকে আমাদের সবাইকে একটি করে খাম দিয়ে দিলেই তো হয়। দুর্নীতি না করলে কি বড় হওয়া যায়!
পাশে বসে থাকা এক বিদেশি দূত বললেন, আপনারা ভাবছেন আমি আপনাদের ভাষা বুঝতে পারব না, আমি সব শুনেছি এবং বুঝতে কষ্ট হয় নি। শুনে রাখুন, আপনারা যার যার অবস্থান থেকে অনিয়ম করতেই হবে, এমন ধারণা থেকে আপনাদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে। যে যায় লংকায় সে হয় রাবন এমন চিন্তা ধারা পরিহার করতে হবে। দুর্নীতি ও অনিয়ম থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আপনারা সমগ্র বিশ্বের কাছেই একটি খারাপ, নিকৃষ্ট ও স্যাংশনভূক্ত জাতি হিসেবে পরিচিতি পাবেন।
আজ থেকে প্রায় শত বছর আগে কাজী নজরুল জাতিকে হুসিয়ারী দিয়ে বলেছিলেন: ”দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুরস্ত পারাপার লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি-নিশীথে, যাত্রীরা হুসিয়ার…..ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, কার আছে হিম্মৎ?” – হে নজরুল, তুমি আজ আমাদের মাঝে নেই, এত বছর পরেও তোমার সেই বিদ্রোহের সুর আমাদের আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করছে। আমরা আজও পারি নি দুর্গম গিরি জয় করতে, আমাদের ছেঁড়া পাল ছেঁড়াই রয়ে গেল। এমন একজন হিম্মৎধারী কোন নেতা/দল আজও পাইনি যিনি বা যাঁরা আমাদের এই জাতিকে উত্তাল সাগরের মধ্য থেকে কূলে পৌঁছে দেবে। সবাই কেবল নিজের উন্নয়ন নিয়েই মহাব্যস্ত।