সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চারিত কিছু শব্দ: রক্ষণশীলতা,উদারতা। নম্রতা, উগ্রতা। পশ্চাৎমুখী। জ্ঞান ও অজ্ঞানতা। কোথাও কোথাও এইগুলি সচারচর শোনা যায় বা এইসব নিয়ে আলোচনাও হয়। মাঝে, মাঝে চোখের সামনেও আসে। মনে একরকম ভিন্ন অনুভূতিও সৃষ্টি করে। এইসবের ব্যাপারেও আমাদের জ্ঞান কিন্তু সীমিত। উল্লেখিত শব্দগুলিকে একেক জন একেক ভাবে ব্যাখ্যা করেন বা দেখেন। কোনটাই চূড়ান্ত না। সব ব্যাখ্যাই নির্ভর করে নির্দিষ্ট স্থান,কাল, সময়, শিক্ষা এবং এর আর্থ সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থান ও তার সংস্কৃতির অবকাঠনের উপরেও।
বর্তমান এই সময়, ব্যক্তি স্বাতন্ত্রের এক বিশেষ পর্যায়ে আমরা। এখানে ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে আমাদের অনেক ব্যবহার ও কাজকে অনেক জায়গায় সময়ের পরিবর্তন বা আধুনিকতাও বলা হয়। এই “আধুনিক” শব্দের অর্থ স্বেচ্ছাচারিতার পর্যায়েও পড়ে। রবীন্দ্রনাথের একটা গল্প, “অন্দর বাহির”। নারী পুরুষের ঘরে বাইরের সমস্যাকে বোঝানোর তাগিদেই গল্পটা রচিত বলে অনেকেই মনে করেন। তবে বর্তমান সময়ে নারী পুরুষের সম অধিকারের প্রশ্ন এবং নারীবাদের প্রসঙ্গ এই আলোচনায় অনিবার্যভাবেই এসে যায়।
নারীবাদ যদি স্বতন্ত্র শিরোনাম হিসাবে আলোচিত হয়, তবে অন্দর বাহির; এর পার্থক্য অথবা পৃথক বিন্যাস পুনরুক্তির আশঙ্কা এবং অসম্পূর্ণের খামতি থেকে মুক্ত কি? । রবীন্দ্রনাথের ঘরে বাইরে উপন্যাসের নামকরণেই সম্ভবত বাঙালির বয়ানে অন্দর বাহির, এর আবাহন সূত্র মিলে। এখানে “ব্যক্তিগত” শিক্ষা এবং “ব্যক্তি” শিক্ষার একটা বিষয় থেকে যায়।
উনিশ শতক জুড়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের জয়যাত্রায় ইংরেজ যখন সভ্যতার শিখরে উঠে তখনকার ইংরেজ সমাজে ঘরের বাইরে একটা মেয়ের কোন আলাদা ব্যক্তিত্ব প্রায় অকল্পনীয় ছিল। সময়ের সাথে সাথে সেটাও বদলেছে।
এখন দেখি, ঘরের বাইরে নারীর যোগদান যত বাড়ে, জ্ঞানের অন্বেষণে বা জীবিকার তাগিদে অর্থাৎ মানসিক, সামাজিক, কি অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার অনিষ্টে নারীর পরিক্রমা যতই ব্যাপ্ত হয়,
ততোই সে বুঝেছে যে, অন্দরের এযাবৎকালের ভার থেকে তার রেহাই নাই। বরং বাইরের সাথে তার যা কিছু বিনিময়, সবই বুঝি অন্দরকে সুদৃশ্য থেকে সুদৃশ্যতর করবার আয়োজনে।
অন্দরের সুশৃংখল রক্ষণে পুরুষ নারীর সহায়ক, আবার বাইরের অভিজ্ঞতায় নারী যদি সহায়ক থেকে অর্জনকারীর ভূমিকায় পৌঁছে যায়, তখন অনেক সমাজ ও পরিবারেও “শৃঙ্খলা” ব্যাহত হয়। বাইরের জগৎ নিয়ে পুরুষের অহংকার আর অন্দর নিয়ে নারীর সাবেকি সহিষ্ণুতার যুগলবন্দিতে সমাজের এই অভ্যস্ত ছকটা নির্ভর করে। বর্তমানে এই সময় নারীর সাবেকি সহিষ্ণুতার সাথে নতুন অহং এর একটা বিশেষ যোগাযোগ স্বাভাবিক। অথচ নারী পুরুষের অহঙ-এর সাম্য আজও তেমন স্বীকৃত নয় অনেক সমাজেই। তাদের ঘাত প্রতিঘাতের সামনে সমাজের পুরনো অভ্যাস নতুন দিশা খোঁজে। এ -ও সত্যি।
সেই দিশা অন্বেষার পথে অনেক ক্ষেত্রে নারীকে কেন্দ্র করেই উল্লিখিত আলোচনার “দ্বিধা” নিয়ে আজকের সংক্ষিপ্ত আলোচনা। রক্ষণশীলতা, উদারতা, নম্রতা, উগ্রতা, অগ্রগামী বা এডভান্স। শব্দগুলি সাধারণত আধুনিক অনেক মেয়ে যারা বাইরের জগতে বেশি ব্যস্ত, তাদের আচার-আচরণে লক্ষ্য করি, মন্তব্য করি বা প্রতিবাদ করি। এর কিছুকে কেউ বলেন রক্ষণশীলতা, কেউ মনে করেন এটা এক ধরনের পশ্চাদ মুখী চিন্তা। কেউ বিষয়টাকে এভয়েড করে চলেন, একটা উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। কারো কারোর কাছে এটা সময়ের বাস্তবতা। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, এখন সমাজে লিভিং টুগেদার, ডিভোর্স, ছেলে মেয়ের অবাধ বন্ধুত্বের সংস্কৃতি ক্রমান্বয়েই “দ্রুত” বাড়ছে। এই ব্যাপারকে কেন্দ্র করে সমাজে অনেকেই মেয়েদেরকেও দোষারোপ করি। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বস্তু জগতের নানান রকম চাহিদার সমন্বয়ে যে মন মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে সেটা কেবল নারীদের না পুরুষদেরও। তবে সাধারণত পুরুষদের ক্ষেত্রে রক্ষণশীল, উশৃংখল, অভদ্র। কথাগুলি যতো না আসে, তার চেয়ে বেশি আসে মেয়েদের প্রশ্নে। এখানে আমাদের জ্ঞানের কিছুটা সীমাবদ্ধতা আছে। স্বীকার করি বা না করি।
সাধারণভাবে উগ্রতা, নম্রতা, রক্ষণশীলতা। এর প্রত্যেকটারই এক একটা সাধারণ সংজ্ঞাও আছে। সেটা চিরন্তন না হলেও অনেকটাই এর কাছাকাছি। যেমন এখনকার মানুষের কেউ যদি মনে করেন, এটা আমার ব্যক্তিগত অধিকার, আমি উলঙ্গ থাকবো। আধুনিক কালে ‘ব্যক্তিগত অধিকার” প্রশ্ন নিয়ে যদি ভাবি তাহলে বিষয়টাকে কিন্তু মেনে নেবার কথা। এটাকে “অনাধুনিক” চিন্তা বলাও কঠিন। সেই কারণে “ব্যক্তি স্বাধীনতার” এই সময় আমরা কারো কোন ব্যক্তিগত চালচলন, ইচ্ছা বা অনিচ্ছার পথে বাধা দিতেও পারি না। উগ্রতা। এটাও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অন্তর্গত। উদারতা, সেটাও তাই। তাই এই বিষয়গুলি নিয়ে চট করে কোন মন্তব্য না করে, প্রত্যেকের প্রতি যথেষ্ট সম্মান এবং তার ব্যক্তিগত পরিবেশ, পরিস্থিতিকে বুঝে করা দরকার। কোন সমাজে কোন শৃঙ্খলা বা কোন নীতি প্রতিষ্ঠিত হতে সুদৃষ্টান্ত দরকার হয়। মোটিভেশন দরকার। সমালোচনা বা শুধু আলোচনায় বিষয়গুলি অর্জন করা যায় না।
বিভিন্ন সময়ে জীবনের ডাকে সভ্য মানুষদের মন আকর্ষণ করেছে ইতিহাস অনেকবার। সেখানে তাদের কর্ম, মনন, অনেক মানুষকে বিচ্ছিন্ন করেছে তাদের সংসার এবং অনেক সম্পর্ক থেকেও। একটা সময় আমরা দেখেছি অনেকের বলতে যে, সমাজে নারী শিক্ষা অপরিহার্য।
কিন্তু সেই একই বাড়িতে দেখা গেছে একজন নারী অন্দরমহলে থেকে জীবনযাপন করে গেছেন, শিক্ষার আলো ঘরে যেতেও দেয়া হয়নি তাকে। কিন্তু আধুনিক বাঙালি নারী নিজের বহিরাগমনকে সার্থক করে তুলছে ও তুলবে অনেকখানি। এও সত্যি।
বিনয়, ভদ্রতা, অগ্রতা, শালীনতা ও আশালীনতা। এই বিষয়গুলির চর্চা এবং সংজ্ঞা অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তির নৈতিক এবং ধর্মীয় জ্ঞানের উপরেও নির্ভর করে। আধুনিক সময় আমরা এই ভেতরের জ্ঞান থেকে দূরে সরে যাচ্ছি কোনো না কোনো কারণে। ব্যক্তির “এনলাইটমেন্ট” প্রজ্ঞার অভাবেও। আলোক পর্বের সমাজ দর্শন ইদানিং কেমন যেন আমাদের পেছনের দিকেও হাঁটায়। এটা যে খুব আশ্চর্যের তাও নয়। সভ্যতার এই স্তরবিভাগ এক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিতে মনে হতে পারে নেহায়েত স্বাভাবিক। কিন্তু এর ভিত্তি যে আছে এক ধরনের উন্নাসিক পাশ্চাত্যমুখীতার মধ্যেও, এই বিষয়ে সন্দেহ করা মুশকিল। আধুনিকোত্তর যুগের নতুন দর্শন আর এর গভীরতার ইতিহাস-,বোধের সামনে পশ্চিমকেন্দ্রিক যুক্তি, প্রগতি, সভ্যতার ধারণা গুলি প্রাচ্যের দর্শনে এসে ধাক্কাও খায়। এই উপলব্ধিটাও আমাদের দরকার।
তাহলে আমাদের সমাজে “উগ্রতার” সংজ্ঞা বা আধুনিকতার সব সংজ্ঞা পশ্চিমাভাবা সম্পন্ন হবে না। আমরা মিলতে গিয়ে বা মিলাতে গিয়ে স্বকীয়তা হারালে আমাদেরই অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবার আশঙ্কা সৃষ্টি হবে।
সমাজে আমরা নারী পুরুষ উভয়ের সম্পর্কে ও আচার আচরণের কিছু, কিছু দ্বন্দ্ব-বিদ্বেষের মধ্যেও আটকে যাই। দ্বন্দ্ব ও বিদ্বেষ। দুইটা পৃথক অর্থ বহন করে। দ্বন্দ্ব মানে সংঘাত। আবার এই দ্বন্দ্ব মানে মিলন বা সমবায়। যেমন দ্বন্দ্বসমাস। আমাদের অবস্থাভেদটা শুধু বস্তুভেদের উপর নির্ভর করে না, অনেক ক্ষেত্রেই সেটা নির্ভর করে দৃষ্টি বা সময়ের প্রসারের ওপরেও। অতএব স্বার্থ বুদ্ধি অবস্থা এবং দৃষ্টিভেদে কখনো আমাদের তা এক পথে চালিত করে কখনো অন্য পথে। স্বার্থের দিগন্ত যদিও সীমাবদ্ধ, তবু স্বার্থ বুদ্ধি কিছুটা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। স্বার্থের সাথে বুদ্ধি যোগ হলে তখনই সেটা স্বার্থবুদ্ধি হয়ে ওঠে। স্বার্থবুদ্ধি কিছুটা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বলে একান্তভাবে সংঘাতমুখী নয়, বরং সংঘাত ও সহযোগের চিন্তা তাতে একইসঙ্গে বর্তমান। এইভাবেই সমাজে আমাদের পুরুষ মহিলা বা নারী পুরুষের আচার-আচরণে, ব্যক্তির পোশাক-আশাক, কথাবার্তায় সাধারণ সৌজন্যতা, বিনয় ও নম্রতা থাকা দরকার। সমাজের সম্ভাবনাময় অগ্রযাত্রার পথে তা বড় সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। কেবল তখনই আমরা উল্লেখিত শব্দগুলির প্রয়োগ এবং ব্যবহারে ব্যক্তিগতভাবে অনেক বেশি সচেতন হতে পারি, সেটাকে “সাধারণীকরণ” (Generalized ) না করে। লেখক মোর্শেদা আক্তার সুমি ( ২৭/১২/২০২৩)