নোয়াখালীতে কোথাও উন্নতি, কোথাও অবনতি, ত্রাণের জন্য প্রত্যন্ত এলাকায় হাহাকার বানভাসিদের।

ভারি বৃষ্টিপাত ও ফেনী থেকে আসা উজানের পানির চাপ অব্যাহত থাকায় গত ২৪ ঘণ্টায় নোয়াখালীর সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি কোথাও উন্নতি ও কোথাও অবনতি হয়েছে। এর মধ্যে জেলা শহর মাইজদীসহ সদর উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। জেলার দুর্গম অনেক এলাকায় ঠিকমতো ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না বলে জানান বাসিন্দারা। ফলে পর্যাপ্ত ত্রাণ পেতে হাহাকার করছে বন্যার্তরা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার সেনবাগ, কবিরহাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বেগমগঞ্জ, সোনাইমুড়ী ও চাটখিল উপজেলার বন্যা কার্যত অপরিবর্তিত রয়েছে। আর জেলা শহর মাইজদীসহ সদর উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে।
গতকাল (সোমবার ২৬ আগস্ট) রাতে ও আজ (মঙ্গলবার ২৭ আগস্ট) সকালে বৃষ্টিপাতের ফলে কিছু এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে বলে জানান পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। জেলা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ পর্যবেক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, সোমবার সকাল ৯টা থেকে আজ ২৭ আগষ্ট (মঙ্গলবার) সকাল ৯টা পর্যন্ত জেলা শহর মাইজদীতে ৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা আগের ২৪ ঘণ্টার তুলনায় ৩৮ মিলিমিটার কম। আগের বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ১০২ মিলিমিটার। আগামী ২৪ ঘণ্টায়ও জেলায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে এমন সতর্কবার্তা দেন।
এদিকে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বন্যার পানিতে নিমজ্জিত থাকলেও জেলার বন্যাকবলিত উপজেলাগুলোর প্রত্যন্ত এলাকায় এখনো ঠিকমতো ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। অথচ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ত্রাণবাহী অনেক গাড়ি প্রতিদিনই নোয়াখালী ঢুকছে। মূলত প্রশাসনের সঙ্গে ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত ত্রাণ কার্যক্রমের সমন্বয় না থাকায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
সেনবাগ উপজেলার কেশারপাড় ইউনিয়নের লুদুয়া গ্রামের বাসিন্দা সেনাসদস্য মো. মামুন বলেন, তিনি দুই দিন ধরে উপজেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করছেন ত্রাণের জন্য। কিন্তু এখনো ত্রাণ পাননি। ব্যক্তিগতভাবে কিছু ত্রাণের ব্যবস্থা করেছেন। তার এলাকার বেশির ভাগ মানুষ এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণ পায়নি। এ অবস্থায় ত্রাণের জন্য বন্যায় পানিবন্দী মানুষের মধ্যে হাহাকার চলছে।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আখিনূর জাহান নীলা বলেন, নোয়াখালী শহর ও সদরের বেশির ভাগ ইউনিয়নে বন্যার পানি এখনো কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এখানে বন্যাকবলিত অনেক মানুষ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত চাল, নগদ টাকা ও শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিয়মিত তাদের খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। অসুস্থদের দেয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা।
তবে আশ্রয়ন কেন্দ্রে আশ্রিতরা সরকারি, ব্যক্তি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে খাবার ও চিকিৎসা সুবিধা পেলেও গ্রামের দুর্গম এলাকার পানিবন্দি মানুষ ত্রাণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন বলে অভিযোগ অনেকেরই।
এদিকে মঙ্গলবার দুপুরে সদর উপজেলার নোয়াখালী ইউনিয়নের মান্নান নগর এলাকার বন্যায় পানিবন্দি সরকারি ত্রাণ সুবিধা বঞ্চিত মানুষের মধ্যে স্থানীয় সেনাসদস্য জহিরুল ইসলাম ও নোবিপ্রবি প্রেসক্লাবের সহযোগিতায় ঘরে ঘরে ত্রাণ পৌঁছে দেয়া হয়েছে। এসময় ভোরের কাগজ ও নাগরিক টেলিভিশনের সাংবাদিক মোহাম্মদ সোহেল, বিএনপি নেতা ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন মঞ্জু’সহ স্থানীয় যুব সমাজের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে, মঙ্গলবার বিকেলে জেলা শহরের হাউজিং, মেথরপট্টি, নোয়াখালী কলেজ এলাকা, কোম্পানিগঞ্জ, সেনবাবাগ, সোনাইমুড়ী উপজেলাসহ বন্যাকবলিত এলাকায় বন্যার্তদের মধ্যে শুকনো খাবার, ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এন-রাশ। এ সময় সংস্থার প্রধান নির্বাহী আবুল হাশেম, পরিচালক মো. আকরাম হোসেন হৃদয়সহ সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নোয়াখালীতে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে।
কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও ভারতের ছেড়ে দেওয়া উজান থেকে নেমে আসা নোয়াখালীতে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে চরম দুর্ভোগে রয়েছে কয়েক লাখ মানুষ। জেলার মূল সড়কের আশপাশে সহযোগিতা পেলেও প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে পৌঁছায়নি ত্রাণ সহায়তা। ফলে সেখানে দেখা দিয়েছে খাদ্য ও সুপেয় পানির সংকট। স্বাস্থ্য ঝুঁকির শঙ্কায় রয়েছে ক্ষুধার্ত অধিকাংশ শিশু। ফলে অধিকাংশ জায়গায় দেখা দিয়েছে ত্রাণের জন্য হাহাকার।
সরেজমিনে নোয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, জেলার নয়টি উপজেলার মধ্যে আটটিতেই বন্যার পানি বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে জেলার সেনবাগ, বেগমগঞ্জ, সদর, সোনাইমুড়ী ও চাটখিল উপজেলার বন্যার পানি। এসব উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকাগুলোয় সরকারি-বেসরকারি কোনো ত্রাণই এখন পর্যন্ত পৌঁছায়নি। ফলে বন্যার্ত মানুষ সীমাহীন কষ্টে দিন যাপন করছেন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, নোয়াখালীর ৮ উপজেলার ৮৭ ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে ২০ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছেন। ১ হাজার ১৬৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন দুই লাখ ১৬ হাজার মানুষ। তাদের মধ্যে নগদ ৪৫ লাখ টাকা, ৮৮২ টন চাল, ১ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার, ৫ লাখ টাকার শিশু খাদ্য ও ৫ লাখ টাকার গো খাদ্য বিতরণ করা হয়েছে।
বেগমগঞ্জ উপজেলার একলাশপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের জয় কৃষ্ণরামপুর গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয় নিয়েছেন বিধবা হোসনে আরা। তিনি বলেন, এখানে থাকার মতো, ঘুমাইবার মতো অবস্থা নেই। আল্লাহ আমাদের এভাবে রাখছে। একটা কাপড় একটা জামা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে আইসি। আমার সামর্থ্য নাই ঘরবাড়ি করার। ছেলেরাও গরিব। কিচ্ছু করতে পারবে না তারা।
বন্যা না কমলে সব শেষ হয়ে যাবে উল্লেখ করে বৃদ্ধা শাহ আলম বলেন, এত পানি আমি ৭০ সালেও দেখি নাই। ২০২৪ সালে পানি আর পানি। আমাদের ঘরবাড়ি সব ডুবে গেছে। যদি বন্যা না কমে, আমাদের ঘর বাড়ি সব উল্টে যাবে।
জেলা প্রশাসক দেওয়ান মাহবুবুর রহমান বলেন, প্রথমে আমাদের খাবারের একটু সমস্যা ছিল। এখন আমরা পর্যাপ্ত শুকনো খাবার পাচ্ছি। এছাড়া বিভিন্ন সংস্থা আসছে, ব্যক্তিগতভাবে অনেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসছে। তাছাড়া সরকারিভাবে নগদ ৪৫ লাখ টাকা, ৮৮২ টন চাল, ১ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার, ৫ লাখ টাকার শিশু খাদ্য ও ৫ লাখ টাকার গো খাদ্য বিতরণ করা হয়েছে। আমাদের সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত আছে।বেগমগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুর রহমান বলেন, আমাদের প্রতিটা ইউনিয়নে সচিবদের সঙ্গে ছাত্রদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা দুর্গত এলাকাগুলোতে সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে।
এছাড়াও অনেকে ব্যক্তিগতভাবে এসে ত্রাণ দিয়ে যাচ্ছেন। সেই হিসাবগুলো আমাদের কাছে নেই। তবে যারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, আমরা প্রতিটা ইউনিয়ন অনুযায়ী তা বন্ধন করছি। তাছাড়া যদি কেউ আমাদের কাছে অভিযোগ করলে সেগুলো আমরা লিখে রাখছি। পরে সেসব এলাকায় খাদ্য সরবরাহ করছি।