নোয়াখালী সোনাইমুড়ীর আকাশ-বাতাস বিষাদে ভারী হয়ে উঠেছে। যে মানুষটি তার সারা জীবন আদর্শের রাজনীতি করে গেছেন, যিনি কখনো টাকার কাছে মাথা নত করেননি, সেই জননন্দিত নেতা আনোয়ারুল হক কামাল আজ চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন। আজ সকাল ১১টায় নিজ পারিবারিক কবরস্থানে চতুর্থ জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়। এই বিদায় কেবল একটি মৃত্যু নয়, এটি যেন আদর্শের এক করুণ পরাজয়ের সাক্ষী। তার এই হৃদয়বিদারক বিদায়ে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষের চোখে ছিল অশ্রু, আর হৃদয়ে ছিল অব্যক্ত বেদনা।
গত ১৪ আগস্ট ভোরে ঢাকার বারডেম হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৭০ বছর বয়সী এই নেতা। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকা, সোনাইমুড়ী কলেজ এবং সোনাইমুড়ী রেলওয়ে স্টেশনসহ মোট তিনটি স্থানে জানাজার আয়োজন করা হয়। আজ জুমার নামাজের পর নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে চতুর্থ জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়।
দাফনের পূর্বে অনুষ্ঠিত জানাজায় উপস্থিত ছিলেন হাজার হাজার নেতাকর্মী। এই শোকের মুহূর্তে বেগমগঞ্জ গণমানুষের নেতা সাবেক এমপি ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী বরকত উল্লাহ বুলু আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, আনোয়ারুল হক কামাল ছিলেন একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মী। তার মতো নিবেদিতপ্রাণ নেতা পাওয়া দুষ্কর। অথচ আমাদের এলাকার একজন প্রভাবশালী এমপির মৃত্যুর পর তার জানাজায় এর এক শত ভাগের এক ভাগ মানুষও হয়নি। তার জানাজায় হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিই প্রমাণ করে তার আদর্শের রাজনীতি কতটা সফল ছিল।বুলু আরও বলেন, আনোয়ারুল হক কামাল কোনো হাইব্রিড নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী।
বার কাউন্সিলের অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি, সোনাইমুড়ীর গণমানুষের নেতা ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন আবেগময় স্মৃতিচারণ করে বলেন, দুই দিন আগে তিনি আমার চেম্বারে এসে সকলের সামনে কেঁদেছিলেন। জেলা বিএনপির কমিটি এবং কিছু নেতার আচরণে তিনি অনেক কষ্ট পেয়েছিলেন। একজন অসাধু নেতা তাকে সোনাইমুড়ী উপজেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে রাখতে চান না এবং খারাপ ব্যবহার করেন। ব্যারিস্টার খোকন বলেন, তিনি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, আপনি চলে যান, আমি দেখছি। রাজনীতি আদর্শকে কখনো কিনতে পারে না।কিন্তু তার পরদিনই তিনি মৃত্যুর খবর পান। ব্যারিস্টার খোকন বলেন, দলীয়ভাবে এই ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা আশ্বাস প্রদান করেন।
এই স্মৃতিচারণের সময় উপস্থিত হাজার হাজার নেতাকর্মী কান্নায় ভেঙে পড়েন। অনেকে বিনিময়ে পদ কেনাবেচার এই নোংরা রাজনীতির তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিচার দাবি করেন। তারা বলেন, একজন আদর্শবান নেতা যদি টাকার কাছে বিক্রি হয়ে যায়, তাহলে এই রাজনীতি ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে।এ কথাগুলো বলেছিলেন সোনাইমুড়ী উপজেলার শীর্ষস্থানীয় বিএনপির একজন নেতা তার নাম প্রকাশ নিষেধ করেছেন।
আনোয়ারুল হক কামাল রাজনৈতিক জীবনে বহু দমন-নিপীড়ন সহ্য করেছেন, জেল খেটেছেন, কিন্তু আদর্শ থেকে একচুলও বিচ্যুত হননি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তার কোনো সম্পদ ছিল না, ছিল কেবল একটি ভাঙাচোরা টিনের ঘর। তিনি প্রমাণ করে গেলেন, রাজনীতি তার কাছে ক্ষমতা বা অর্থ উপার্জনের মাধ্যম ছিল না, ছিল মানুষের সেবা করার এক পবিত্র ব্রত। তার এই ত্যাগ এবং সততা আজীবন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
আজ এই শোক কোনো সাধারণ শোক নয়, এটি একজন অভিভাবককে হারানোর বেদনা। আনোয়ারুল হক কামাল আজ না ফেরার দেশে চলে গেছেন, কিন্তু তার রেখে যাওয়া আদর্শের বাতিঘরটি আমাদের হৃদয়ে চিরকাল জ্বলবে। তার মতো একজন নেতাকে হারানোর বেদনা কোনো শব্দ দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। তার বিদায় এক হৃদয়বিদারক করুণ চিঠি, যা সোনাইমুড়ীর প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে গেঁথে রইল। এসময় উপস্থিত ছিলেন নোয়াখালী লক্ষীপুর ফেনী ও কুমিল্লার আশেপাশের উপজেলার সভাপতি সেক্রেটারি
ও নোয়াখালী জেলার প্রতিটি উপজেলার সভাপতি সেক্রেটারি সোনাইমুড়ি উপজেলার দশ ইউনিয়নের নেতাকর্মীর সহ কেন্দ্রীয় শীর্ষস্থানীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন ।